আলো জ্বালানোর ডাকে লকডাউনে কষ্টে থাকা মানুষের উদ্বেগের কথা কোথায় প্রধানমন্ত্রী? #PostEdit
অরুনাভ সেনঃ ভেবেছিলাম কিছু লিখব না৷তবে সকালে প্রধানমন্ত্রীর এমন আবেদন বার্তায় নিজেকে কেমন যেন অন্ধকারের এক যাত্রী মনে হল!মনে হল গিমিক আর ফুটেজের রাজনীতি আজও ভারতজুড়ে চলছে৷আমরা মহানন্দে বাহবা দিচ্ছি,দিয়ে চলেছি,ভবিষ্যতেও দেবো৷আসলে প্রচারমাধ্যমের সার্চলাইটে থাকা একটা আর্ট৷ইদানিং রাজনীতির ম্যানেজমেন্ট গুরুরা সেই বিষয় আরও পরামর্শ যোগান দেশের বড় মাপের রাজনীতিবিদদের৷ জনগন ঠিক চাইছেন,জনগন কি বলতে চাইছেন কি শুনতে চাইছেন কি চাইছেন না সেটা তাদের কাছে গৌণ বিষয়৷বরং তারা চান হ্যাঁ খুব ভালভাবেই চান সর্বদা প্রচারের সার্চলাইটে কিভাবে থাকা যায় সেই পরিস্থিতি তৈরিতে৷
করোনা ভাইরাসের অন্ধকারময় পরিস্থিতি কাটাতে রবিবার রাত ৯টার সময় ৯ মিনিটের জন্যে প্রদীপ, মোমবাতি, টর্চ বা মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইট জ্বালানোর অনুরোধ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।এতে করে নাকি করোনা সংক্রমণের বিরুদ্ধে মনোবল বেড়ে যাবে আমার,আপনার আমাদের সবার!তাই আমাদের একজোট করতেই ঘরের আলো নিভিয়ে ৯ মিনিটের জন্যে ওই কাজ করার অনুরোধ করেছেন৷উনি একতার বার্তা দিতে চেয়েছেন,দেশের মানুষকে একজোট করতে চেয়েছেন৷খুব ভাল৷অনেকেই বলবেন জাতীয়তাবাদের জন্য এর থেকে আর ভাল কি বার্তা হতে পারে?আমি আজন্ম বিশ্বাস করে এসেছি কোনও শিশু যখন ভূমিষ্ঠ হয়ে পৃথিবীর প্রথম আলো দেখে,ভালবাসতে শেখে তার মাকে,তেমনই দেশের কোনও নাগরিক তাঁর নিজের অজান্তেই হৃদয় আর আবেগ দিয়ে ভালবাসে আর এক মা দেশ মাতৃকাকে৷আসলে দেশকে ভালবাসা,মাকে ভালবাসা হৃদয়ের অন্তরস্থল থেকে উঠে আসা একটা অনুভূতি,একটা আবেশ,এক অনন্য আবেগ৷যা জাগ্রত হয় দেশমাতৃকার বিপদে,নিজের জন্মদাতা মায়ের কষ্টে অথবা সুখের দিনে৷সে অনুভূতি অনির্বচনীয়৷ভাষায় প্রকাশ-ব্যাখ্যা অসম্ভব৷ এই একজোট হওয়ার বার্তাটা সেই বিজেপির আরও একবার নতুন রূপে একটা চেনা জিনিসের বিপননের নতুন স্টাইল, একতার মুখোশের আড়ালে,বকলমে মতাদর্শের প্রচার৷হ্যাঁ বিজেপি দেখিয়েছে,প্রমানও করেছে তারা একজোটকে চমৎকার ভাবে, রাজনৈতিক ভাবে বিকিকিনি করা যায়৷
আমি জানি এটা মোটেও রাজনীতির সময় নয়৷আমি জানি দেশ একজোট হয়ে লড়ছে৷আমি জানি লকডাউন চলছে৷আমি জানি বিদেশের অনেক বিত্তশালী,প্রভাবশালীরা করোনা নিয়ে দেশে ঢুকেছেন৷আমি জানি বিদেশে আটকে থাকা দেশের সন্তানদের উড়িয়ে আনতে উড়েছে এয়ারইন্ডিয়ার বিশেষ ফ্লাইট এগুলো সব আমি জানি,জানেন দেশের সব মানুষ৷তবে হলফ করে বলতে পারি আপনারা অনেকেই জানেন না ভ্রমরলালের কথা৷আমার সমস্যা হচ্ছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক পার্থপ্রতীম বিশ্বাস আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধার মানুষ৷টিভির টক শোয়ে যত মানুষ বলেন সবার প্রতি আমার অকুন্ঠ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি ঐ মানুষটির প্রজেন্টেশন,পড়াশোনা,যুক্তির জাল আমি কেন রাজ্যের কোটি-কোটি মানুষকে মুগ্ধ করে৷সেই জন্য তাঁর অনুমতি না নিয়েই তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসের কথাগুলো আবার ধার করলাম৷কারন এত ভাল করে বলার বা লেখার ক্ষমতা আমার নেই৷"আমাকে দিল্লির গাজিয়াবাদের বাস স্ট্যান্ডে কাজ হারানো ঘরমুখো শ্রমিকদের ভয়াবহ ছবি আবার মনে করাল – ‘ভাবিয়া করিও কাজ , করিয়া ভাবিও না ‘ । লক ডাউনের মত কাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্তের প্রস্তুতি না নিয়ে পরীক্ষায় বসে দেশের শাসক আজ চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে কোটি কোটি গরিবের ফুসফুস আর পেটের ভাতকে । আসুন যে যার মতো করে ওদের পাশে দাঁড়াই" শিক্ষিত মানুষ রূচিশীল ব্যক্তি সক্রিয় রাজনীতি করেও গিমিকের রাজনীতি করেন না বলে এমন মানবিক কন্ঠ ধ্বনিত হয় তাঁদের মত মানুষদের মুখে৷হ্যাঁ যে ভ্রমরলালের কথা বলছিলাম পরিয়ায়ী শ্রমিক ২৪০কিমি হেঁটে বাড়ি ফিরবেন,প্রত্যয়ী তাঁর মুখ,ক্ষত তার চলার একটি পা৷রানারের মত ঝুমঝুম ঘন্টা না বাজিয়েও সে হাঁটছিল হাইওয়ে ধরে,শুধু মনের জোর আর হার না মানা অদম্য প্রত্যয় নিয়ে৷জানিনা সে ফিরতে পেরেছে কি গ্রামের পরিবারের কাছে৷দেখতে পেয়েছে কি তার স্নেহের আর কাছের মানুষগুলোর মুখ দেখতে৷সত্যি আমরা জানি না৷আপনারা জানেন কী কেউ?আমরা দেশের সাধারন মানুষ৷আমরা প্রত্যয়ী হারাবো করোনাকে৷কিন্তু পরিকাঠামো আমাদের আরও দরকার প্রধানমন্ত্রী৷যেসব অকুতোভয়ের চিকিৎসকরা-নার্সরা কোভিড-১৯এর বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে লড়ছেন তাদের সব ধরনের সাপোর্ট দিন৷অসুস্থ্য মরনাপন্ন রোগীর জীবন বাঁচাতে যত রকমের লাইফ সাপোর্টিং যন্ত্রাংশ আছে সব ব্যবস্থা করুন,অবিলম্বে,দ্রুত গতিতে৷মাস্কের নামে কিছু কাপড়ের টুকরো বিক্রি হচ্ছে খবর রাখেন আপনি৷সেইসব মুখে লাগিয়ে মানুষ ঘুরছেন৷সেই মাস্কগুলো কী আদৌ জীবানু প্রতিরোধের কাজ করতে পারবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,এসব আপনি যদি না ভাবেন কে ভাববে?যদিও প্রধানমন্ত্রী অনুরোধ করেছেন
রাস্তায় বেরিয়ে নয়, দেশবাসীকে যার যার ঘরের বারান্দা বা দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েই ওই আলো জ্বালাতে হবে৷গোলটা ঠিক এখানেই বেঁধে গেল৷বেশিরভাগ মানুষ এমন সিদ্ধান্তকে কটাক্ষ করেছেন৷সেটা স্বাভাবিক না অস্বাভাবিক আপনারা বলুন দেখি৷আমরা বরং শুনি৷বুকে হাত দিয়ে হলফ করে বলুন একজোট হতে এমনটা কি সত্যি খুব প্রয়োজনীয়? নরেন্দ্র মোদির এই আহ্বানকেই কটাক্ষ করছেন তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র, কংগ্রেস নেতা শশী থারুর এবং চিদাম্বরম থেকে সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী৷আমি লেখার প্রথমেই বলেছিলাম আজকের রাজনীতিটা বড্ড গিমিকের হয়ে যাচ্ছে৷জনগনের কথা,জনগনের চাহিদাকে দূরে সরিয়ে রেখে কিভাবে নিজেকে প্রচারের আলোয় থাকতে হয়,রাখতে হয় দেশের স্টার রাজনীতিবিদরা ভাল বোঝেন৷
বলছি না শোম্যানশিপটা ভুল!কিন্তু কোভিড-১৯এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জরুরী মানুষের কষ্ট বোঝা,তাদের আর্থিক উদ্বেগ কমিয়ে আনা যায় সে সম্পর্কে দেশবাসীকে অভয় দেওয়া৷অথবা লক লকডাউন-পরবর্তী সময়ে দেশের অসংগঠিত ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত মানুষরা কিভাবে ফের জীবনের মূল-স্রোতে ফিরবেন সেইসব কোন কথা, সিদ্ধান্ত তাঁর সরকার নতুন অন্য কোন বিষয়গুলি বিবেচনা করছেন সেগুলি তিনি জানালে মানুষ আর একটু চিন্তামুক্ত হতেন৷শুধু স্বপ্ন দেখিয়ে,প্রতিশ্রুতি পালনের অক্ষমতা যে সরকারের আছে তাদের কাছে দেশের মানুষ কি একতা শিখবেন?আবারও বলছি মায়ের কোল আলো করে আসা শিশু পৃথিবীর আলো দেখার দিন থেকেই যেমন শেখে মাকে ভালবাসতে,তেমনই ভালবেসে ফেলে নিজের মাতৃভূমিকে৷দুই মায়ের আনন্দে যেমন সেই নাগরিক আবেগে আপ্লুত হন,তেমনই দুই মায়ের করুণ দশায় তার হৃদয়টা ফাটে৷আজ ভারত বড় বিপদের সামনে৷দেশের প্রতিটি নাগরিক কোভিড-১৯বিরুদ্ধে লড়ছে৷আমরা সবাই একতাবদ্ধ,আমরা সবাই ভারতবাসী,আমার করবো জয়,আমরা হারাবো করোনাকে৷আমাদের নতুন করে একজোট হওয়ার বার্তা দিয়ে শোম্যান রাজনীতি অন্তত এই মুহূর্তে বড্ড বেমানান লাগল৷
বিরোধীদের অবশ্য জবাব দিলেন বিজেপি নেতা বিএল সন্তোষ। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী মোদি একজন যোগ্য অভিভাবকের মতো "দেশবাসীকে হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন ও আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছেন"।দলের নেতার স্বপক্ষে তিনি বলতেই পারেন তবে তাঁর কথায় আর কাজে বোধহয় আত্মবিশ্বাস পাচ্ছেন না দেশের বেশিরভাগ মানুষ,বরং তাঁরা হতাশ,শুনতে চেয়েছিলেন আশার কথা,শুনলেন আলো জ্বালানোর কথা৷ তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক কিছু শুনছি আমরা৷সেগুলো আর এখানে লিখতে চাই না৷কেন নয় না হয়ে ছয় মিনিট নয়,কেন ৮বা ১০মিনিট নয়?

No comments