ছাতু : জঙ্গলমহলের মানুষের বর্ষাকালীন উপার্জনের অন্যতম উপায়।
প্রদীপ মাহাত: সমগ্র জঙ্গলমহল জুড়ে আদিবাসী সম্প্রদায়ের আধিপত্য সবচেয়ে বেশি। এদের জীবনযাত্রার পথ প্রাকৃতিক সম্পদ সমৃদ্ধ (জল,জমি ও জঙ্গল) এলাকায়। এখানকার অধিকাংশ মানুষ আজও জীবিকার ব্যাপারে প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। এখানকার সুফলা প্রকৃতি তার সন্তানদের জন্য দুহাত ভরে দেয় জঙ্গলের কাঠ, শাল পাতা, কেন্দুপাতা, দুধিলতা, ধুনা, মধু, ছাতু ও বিভিন্ন ফল মূল।
ঋতুভেদে জঙ্গলমহল জুড়ে মেলে বিভিন্ন প্রাকৃতিক পসরার আয়োজন। এই বর্ষার মরশুমে জঙ্গলমহলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় সম্ভার হলো হরেক রকম জংলী ছাতু। যেমন পুটকা, কাড়ানী, মোধাল, বালি ও মেকা ছাতু অর্থাৎ টিলা ছাতু। তার মধ্যে সব চাইতে সুস্বাদু হলো পুটকা ছাতু। এর অপার্থিব স্বাদ ভুলিয়ে দিতে পারে মটন, চিকেন ও পদ্মার ইলিশ মাছকেও। এখানকার প্রায় সব জঙ্গল এলাকাতেই এই ছাতু পাওয়া যায়। এই মরসুমে জমির কাজের বাইরে জঙ্গল থেকে ছাতু সংগ্রহ করে কিছু বাড়তি আয় করে থাকে এখানকার আদিবাসী জনজাতি। বাড়ির মহিলা এবং কিশোরীরা মূলত ছাতু সংগ্রহের কাজ করে থাকে। ছাতু সংগ্রহকারী অনিতা মাহাত বলেন "আগে এক এক জন প্রায় ১০-১২ কেজি করে ছাতু সংগ্রহ করেছি। কিন্তু এখন আর আগের মতো ছাতু পাওয়া যায় না।
সারা দিন জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে ৬-৭ কেজি ছাতু সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে গেছে।" এর কারণ নিয়ে তরুণ পরিবেশ প্রেমী শিক্ষক রাকেশ সিংহদেব বলেন "ছত্রাক বা ছাতু মৃত এবং পচা জীবদেহ বা দেহাংশের উপর জন্মায়। গ্রীষ্মকালে জঙ্গলে পড়ে থাকা শুকনো পাতায় আগুন ধরিয়ে দেওয়ার জন্য এসব এর পাশাপাশি ছাতুর রেনু বা স্পোরগুলিও পুড়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে জঙ্গলের মাটিতে আগের মতো আর ছাতু হচ্ছেনা।" দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি রেসিডেনসিয়াল হাতি আস্তানা গেড়েছে শালবনী, লালগড়, ঝাড়গ্রাম ও বাঁকুড়া জেলার বিভিন্ন স্থানে। এই দল ছুট হাতিদের অতর্কিত আক্রমনে প্রাণ হারিয়েছে বেশ কয়েকজন সাধারণ মানুষ। এই আতঙ্কের ফলে ছাতু সংগ্রহেও ভাটা পড়েছে। চাহিদার তুলনায় আমদানি কম হওয়ায় বাজারে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে ছাতু।
এখন এলাকাভেদে কিলো প্রতি ছাতুর দাম প্রায় ১৭০- ১৮০ টাকা। শহরের বাজারে এই দাম অনেকসময় পাঁচশো পেরিয়ে ছুঁয়ে ফেলে হাজারের অঙ্ক। শহরের ঝাঁ চকচকে শপিং মল আর রিটেলারে যতই সুদৃশ্য প্যাকেটজাত খামারে উৎপন্ন বাটন মাসরুম আলো করে থাকুক না কেন স্বাদে তারা জংলী ছাতুর থেকে কয়েক কদম পিছিয়ে। প্রোটিন সমৃদ্ধ এইসব ছাতুর পুষ্টিমানও নজরকাড়া। জঙ্গলমহলের মহিলারা ছাতু দিয়ে রান্না করেন নানা লোভনীয় পদ। ছাতুর ভাজা থেকে মশলা দিয়ে ঝাল হয়ে চালের গুঁড়ো মিশিয়ে পিঠে পর্যন্ত কি হয়না এই ছাতু দিয়ে।! তাই আজ নিজস্ব স্বাদ এবং গুনের উপর ভর দিয়ে বিশ্বায়নের হাত ধরে জঙ্গলমহলের ছাতু আজ পাড়ি দিচ্ছে কোলকাতা, ঝাড়খন্ড ও ওড়িশায়।
Loading...

No comments