গতবার ছুঁতে পেরেছিল, এবার সিপিআইএম কে গোহারা হারাল তৃণমূল! আহা.. ভোট কারেকয়?
অর্ক সানা, সম্পাদক(নজরবন্দি): বাঙালিরা চিরকালই উৎসব প্রিয়। কিছুদিন আগে পর্যন্তও ভোট ছিল এরাজ্যে উৎসবের মতই, ছোট বেলায় আমরা মজা করে বলতাম ভোট পুজো! যদিও তখন ভোটারই হইনি। চেন ফ্ল্যাগ লাগানো, রঙ বেরঙের ঝান্ডা আর দেওয়াল লিখন। স্লোগান, প্লাটা শ্লোগানে মুখরিত হত পাড়ার রাস্তা থেকে রাজপথ। একটু একটু করে বড় হলাম, বুঝলাম "ভোট কারে কয়"! তবুও ভোটের উৎসবে কোনদিন ভাঁটা পড়েনি...। বুথ দখল, ভোট করানো শব্দ গুলো পরিচিত ছিল কানে। শুনতাম গড়বেতা, আরামবাগ, খানাকুল, গোঘাট, কেশপুর বা আমতা উদয়নারায়ন পুরের কথা!
আমার নিজের বাড়ি হাওড়ার শ্যামপুরে, আপাত নিরীহ যায়গা। সব দল মিলে মিসে থাকে। ভোট কেন্দ্রিক মতাদর্শ গত শ্লেষ থাকলেও কোনোদিন খুনজখমের ঘটনা ঘটেনি।
গতকাল নিজের বসত বাড়ির এলাকায় খোঁজ নিচ্ছিলাম কেমন অবস্থা নোমিনেশনের। জানতে পারলাম আমাদের বুথে সিপিআইএমের কোন প্রার্থী নেই! অবাক হলাম কারন ওই বুথে ৭০০ ভোট থাকলে প্রায় ৫০-৫০ সিপিআইএম তৃণমূল, যদিও ইদানিং কিছু বিজেপি হয়েছে! এলাকার অমুক নেতা কে জিজ্ঞাসা করলাম কেন? বলল আসনটি সিডিউল কাষ্ট সংরক্ষিত হয়ে গেছে! একজন সিপিআইএম কর্মী প্রস্তুতি নিয়েছিলেন প্রার্থী হওয়ার জন্যে। তিনি গিয়েছিলেন পূর্ব-মেদিনিপুর জেলা শাসকের দফতরে, কারন তাঁর শংসাপত্র ছিল ওখানে।
সেখানে গিয়ে হবু প্রার্থী পুলিশ কে জিজ্ঞাসা করেন কোথায় গেলে পাওয়া যাবে শংসা পত্র? না শংসাপত্র মেলেনি, কারন পুলিশ সামনে থাকা লেঠেল তৃণমূল বাহিনীর হাতে তুলে দেয় তাঁকে। কারন ভুল করে ভেবে বসেছিল সে বোধহয় বিরোধীদলের হয়ে মনোনয়ন জমা দিতে গেছে!! ব্যাস লাঠির বাড়ি খেয়ে গ্রামে ফিরে আসে সিপিআইএমের সম্ভাব্য প্রার্থী! প্রার্থী হওয়া আর হলনা তাঁর। এই ঘটনায় সিপিআইএম যতনা ব্যাথা পেয়েছে তাঁর থেকে বেশি ব্যাথা পেয়েছে আমাদের এলাকার তৃণমূল নেতৃত্ব! কারন এবার ভোট উৎসবে থাকছে না সিপিআইএম! তৃণমূল বার বার এলাকার সিপিআইএম নেতাদের তাঁরা অনুরোধ করেছে প্রার্থী দেওয়ার জন্যে। কিন্তু প্রতিবাদ জানাতে সিপিআইএম আর প্রার্থী দেয়নি। এই ঘটনা শুনে ভাবছিলাম আমাদের পুরো রাজ্যটা কেন হাওড়া জেলার শিবপুর গ্রাম হলনা!!!
যাই হোক এবার প্রসঙ্গে আসা যাক এবার রাজ্যে বোধহয় রেকর্ড গড়তে চলেছে তৃণমূল, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় জেতার রেকর্ড! ২০০৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রায় ১১ শতাংশ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় জিতেছিল বাম প্রার্থীরা। ২০০৮ সালে সেই হিসাব নেমে দাঁড়ায় প্রায় ৬ শতাংশ। ২০১৩ সালে তা আবার বেড়ে ১১ শতাংশ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় জয়ী হয় তৃণমূল। আর এবার অর্থাৎ ২০১৮তে যা দেখা যাচ্ছে তাতে শাসক দল অন্তত ১৭ শতাংশ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় জয়ী হতে চলেছে।
কিন্তু এটাকে কি জয় বলে? কিছু প্রশ্ন উঠছে...
১) বিরোধীদের ভোটে অংশগ্রহণ করতে না দেওয়ার ফলে শাসক দলের কাছে ভোট পরবর্তী ফলাফল দেখে সেই পরিসঙ্খানে আসা সম্ভব নয় যে তাঁদের ঝুলিতে কত ভোট রয়েছে! প্রেডিকশন করা যথেষ্ট চাপের হয়ে যাবে ২০১৯ বা ২১ এর নির্বাচনে!! নিজেদের ভোট ব্যাঙ্ক ৩০% না ৭০% তা বোঝা দুরূহ হবে তৃণমূল নেতৃত্বের কাছে!
২) সাধারণ মানুষের কাছে একটা ব্যাপক খারাপ বার্তা গেছে এই মনোনয়নের ঝামেলা ঘিরে। তৃণমূল বিরোধী থাকাকালীন অভিযোগ করত বামেদের লাগামছাড়া সন্ত্রাসে তাঁরা প্রার্থী দিতে পারেনি... প্রমাণ ছিল হাতে নাতে ১১% আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ২০০৩ সালে জিতেছিল বামেরা। যদিও সেই রেকর্ড ২০১৩ সালেই স্পর্শ্ব করেছিল শাসক তৃণমূল আর এবার ১৭% আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়!! অতি বড় তৃণমূল সমর্থকও বলতে পারবেন না উন্নয়নের জয়!!!
৩) নির্বাচন কমিশনের এত হত দরিদ্র দশা আগে দেখেনি পশ্চিমবঙ্গ, মনোনয়নের মেয়াদ বৃদ্ধির নির্দেশিকা দিয়েও রাত পোহালেই তা প্রত্যাহার! এর মানে কি?
৪) উন্নয়নের জোয়ারে ভেষে সবাই তৃণমূল হয়ে যাচ্ছে এটা বলা যতটা সহজ তাঁর থেকে অনেক বেশি কঠিন এই জোয়ারে ভেষে আসা নেতা বা সমর্থকদের এক সাথে নিয়ে চলা, ফলে গোষ্ঠী দ্বন্দ দিন দিন মারাত্মক আকার নিচ্ছে।
৫) আগে পঞ্চায়েত নির্বাচন হত এলাকায় কেমন কাজ হয়েছে বা হয়নি তাঁর নিরিখে, একটা বিধানসভার আলাদা আলাদা পঞ্চায়েতের চরিত্র ছিল আলাদা। কেউ বুকে হাত রেখে বলতে পারবেন এবার তেমন ভাবে ভোট হচ্ছে?... ক্ষতিটা কার? রাজ্য সরকার যা কাজ করেছে তাতে সাধারণ মানুষের ভোট প্রাপ্তিতে তো কোন বাধা থাকার কথা নয়! মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মস্তিস্ক প্রসুত গ্রামবাসীদের জন্যে নেওয়া রাজ্যসরকারের একের পর এক প্রকল্প বিরোধীদের আক্রমন কি ভোঁতা করে দেওয়ার জন্যে যথেষ্ট ছিলনা? কেন আস্থা নেই মানুষের ওপর...?? জ্যোতি বসু বলতেন মানুষের উপর আস্থা হারানো পাপ!

No comments