Header Ads

কোচবিহারে টি২০ ম্যাচে কিভাবে জয় ছিনিয়ে আনল বিজেপি? #Exclusive #PostEdit

বিশেষ সংবাদদাতা, কোচবিহারঃ রুদ্ধশ্বাস টি-টোয়েন্টি ম্যাচের তুলনায় রোমাঞ্চে এতটুকু পিছিয়ে ছিল না এবারের লোকসভা নির্বাচনে কোচবিহার কেন্দ্রের লড়াই। তবে ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলানো ম্যাচের লড়াইতে 'জায়েন্ট কিলার ' হিসেবে উঠে আসা বিজেপির জয় কিন্তু কোনও দুর্ঘটনা নয়। বরং নিরবচ্ছিন্ন সাংগঠনিক প্রস্তুতি এবং ক্ষিপ্র কৌশলের যুগলবন্দি। নিশীথ প্রামানিক এবং ভাস্কর দে!
কোচবিহারে বব উলমার কিংবা বেকেনবাওয়ারের কায়দায় সংগঠন এবং স্ট্র্যাটেজি সাজিয়েছেন বিজেপি নেতা তথা সংঘের পোড় খাওয়া সংগঠক ভাস্কর দে। অন্যদিকে ক্ষমতার চোখে চোখ রেখে "আপনার চোখ রাঙানিকে আমি ভয় পাইনা", নিশীথের কথা বলার ক্ষিপ্রতা সাহস যুগিয়েছে তৃণমূল বিরোধী মনভাবা সম্পন্ন ভোটারদের।  বছর তিনেক আগে লোকসভার উপনির্বাচনে এই আসনে তৃণমূলের চেয়ে প্রায় ৪ লক্ষ ১৪ হাজার ভোটে পিছিয়ে ছিল বিজেপি। অথচ সেই আসনই এবার তারা শাসক দলের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে প্রায় ৫৪ হাজার ভোটের ব্যবধানে। কিন্তু রাতারাতি কী এমন ঘটল যে শাসক দলের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন সাধারণ মানুষ?
দেশ জোড়া মোদী হাওয়ার কথা বলতে পারেন কেউ কেউ। তা নিশ্চয়ই ছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই হাওয়াকে সময়মতো পালে টেনে আনার জন্য আরও দীর্ঘ প্রস্তুতি ছিল সঙ্ঘের। কেউ কেউ তৃণমূল থেকে নিশীথ প্রামাণিককে দলে নেওয়ার জন্য মুকুল রায়কে বাহবা দিচ্ছেন বটে, কিন্তু তাঁদের অনেকেই বিজেপি এবং সংঘের অন্দরের প্রস্তুতির কথা জানেন না। নিশীথ কোনও দিনই সেভাবে মুকুলের পচ্ছন্দের তালিকায় ছিলেন না। তাঁকে বিজেপিতে নিয়ে আসা সংঘের সামগ্রিক পরিকল্পনার অংশমাত্র। কোচবিহার লোকসভার গত উপনির্বাচনে বিজেপি বামেদের পিছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে। শাসক দলের চেয়ে ৪ লক্ষের বেশি ভোটে পিছিয়ে থাকলেও বিজেপি ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় নিজেদের প্রাপ্ত ভোটের শতাংশের হার অনেকটাই উন্নত করতে সমর্থ হয়। ১৬ থেকে বেড়ে ২৮ শতাংশে পৌঁছয় তাদের ভোট। তার আগে ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও বিজেপি'র ভোট বেড়েছিল। পর পর নির্বাচনে ভোট বাড়তে থাকার প্রবণতা লক্ষ্য করে সীমান্তবর্তী এই আসনটি নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করে আরএসএস এবং বিজেপি।
বছর দুয়েক আগে সংগঠন ঢেলে সাজানোর কাজ শুরু হয়। জেলা সংগঠনে মুখ বদল ছাড়াও এক সময় সংঘের অন্যতম সংগঠক ভাস্কর দে'কে ওই লোকসভা কেন্দ্রে বিজেপির পক্ষ থেকে 'পালক' পদে বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়। পেশায় আলিপুর দুয়ার জেলা আদালতের আইনজীবী ভাস্কর গত দেড় বছর ধরে নিজের পেশা ভুলে কোচবিহারে পড়ে থেকেছেন। পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বুথ স্তরে সংগঠন তৈরি করেছেন। ৫-৬ টি করে বুথ নিয়ে ছোট ছোট শক্তিকেন্দ্র তৈরি করেছেন। এবারের লোকসভা নির্বাচনে কোচবিহারে এমন ২৫৮ টি মণ্ডল সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। পাড়ায় পাড়ায় ভাস্করের জনপ্রিয়তা এমন যে কোচবিহারে বিজেপি কর্মীরা তাঁকে চিনতে শুরু করেছেন 'পালক-দা' হিসেবে। মজবুত সংগঠনের ভিতের উপরে শুরু হয় রাজনৈতিক কৌশল পরিকল্পনার কাজ। নির্বাচন ঘোষণার মাস দুয়েক আগে থেকে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের উদ্যোগে জাগরণ মঞ্চের নিবিড় প্রচার। লোকসভা কেন্দ্রের ৮০ শতাংশের বেশি ভোটারদের বাড়িতে পৌঁছে যায় রাষ্ট্রীয় একতার বার্তা। ফলে নির্বাচন ঘোষণার আগেই কোচবিহারে জয়ের মাটি তৈরি করে ফেলে বিজেপি। শেষ পর্বে শাসক দলের দোর্দন্ড প্রতাপ নেতা রবীন্দ্রনাথ ঘোষের বাহিনীর সঙ্গে পাল্লা দিতে শুরু হয় প্রার্থী নিয়ে চিন্তা- ভাবনার কাজ। শুরুতে সংঘের মনোনীত প্রার্থী দীপক বর্মনের নাম আলোচনায় উঠে আসে। পেশায় শিক্ষক দীপক এলাকায় সজ্জন এবং স্বচ্ছ ভাবমূর্তির মানুষ। কিন্তু চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রস্তুতিতে আর কোনও ফাঁক রাখতে চাননি আরএসএস মনোনীত 'পালক' ভাস্কর। ততদিনে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে শত্রু শিবিরের যাবতীয় খোঁজ নিয়ে ফেলেছেন তিনি। ২০১৮ র পঞ্চায়েত নির্বাচনে শাসক দলের দাপটে ভোট দিতে পারেননি গ্রামীণ এলাকার মানুষ। ওই প্রতিকূল পরিস্থির মধ্যে দাঁড়িয়েও রবীন্দ্রনাথ ঘোষের বিরুদ্ধ গোষ্ঠীর তৃণমূল যুবনেতা দিনহাটায় ১০ টি গ্রাম পঞ্চায়েত, ১ টি পঞ্চায়েত সমিতি এবং একটি জেলা পরিষদের আসনে নিজের প্রার্থীদের জেতান। নিশীথের রবীন্দ্রনাথ বিরোধীতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতেই কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার কাজে নামেন বিজেপি নেতৃত্ব। কৈলাস বিজয়বর্গীয়, মুকুল রায় সহ বিজেপির রাজ্য সংগঠনের নেতৃত্বকে বোঝানোর কাজ। তাঁদের সম্মতি আদায় করে সেভাবেই দলে নেওয়া হয় নিশীথ কে। তারপরে নির্বাচনের ফলাফল সবার জানা।
এ প্রসঙ্গে জানাতে চাইলে ভাস্কর নিজে অবশ্য কৃতিত্ব দিচ্ছেন সংঘের জনজাগরণ মঞ্চের প্রচার এবং কোচবিহারের ভোটারদের। তাঁর নিজের কথায়, "সংঘকে বাদ দিয়ে আমরা কেউ কিছু নই। তবে কোচবিহারের মানুষদের ধন্যবাদ। তাঁরা বিজেপির উপরে আস্থা রেখেছেন।''
অন্যদিকে নিশীথ কে নিয়ে ভাস্করের বক্তব্য, "নিশীথ পারবে জানতাম, ১০০% বিশ্বাস ছিল। ওর কনফিডেন্সটাই ওর সম্পদ,  রাজ্যের সব থেকে জনপ্রিয় যুব আইকন হয়ে ওঠার সবরকম গুণ ওর মধ্যে রয়েছে। আগামীদিনে নিশীথ পথ দেখাবে রাজ্যের যুবসমাজ কে। অপেক্ষা করুন আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনেই রাজ্যবাসী বুঝবে নিশীথ লম্বা রেসের ঘোড়া"।
'নায়ক নিশীথ আর 'পালক' ভাস্করের যুগলবন্দীতে এভাবেই ৪ লক্ষের বেশি ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা তৃণমূলের গড়ে কান ঘেঁষে জয় ছিনিয়ে এনেছে বিজেপি। ঠিক যেমন করে বিশ্বকাপের আসরে তুলনামূলক শক্তির বিচারে পিছিয়ে থাকা কোনও দলের কাছে রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে স্নায়ুর চাপ রাখতে না পেরে আচমকা হেরে যায় ফেভারিট দল।

No comments

Theme images by lishenjun. Powered by Blogger.